আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলের নির্বাচনের প্রভাব পড়তে পারে ভারতের ওপরও

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে দেশটিতে শেষ পর্যন্ত কারা সরকার গঠন করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া এবং নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে তার প্রভাব শুধু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গেও দেশটির সম্পর্কের ওপর পড়তে পারে।

গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট। তাদের আসনসংখ্যা ৫৩। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। অন্যদিকে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন। নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ।

কোনো পক্ষই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠনে রাজনৈতিক সমঝোতা জরুরি হয়ে পড়েছে। নেতানিয়াহু সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে আসনসংখ্যার হিসাবে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সামনে সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিরোধী জোটের ৪৮ আসনের সঙ্গে আরব দলগুলোর ১৯ আসন যোগ করলে মোট আসন দাঁড়ায় ৬৭। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সমীকরণ কার্যকর করা সহজ নয়।

এবারের নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর রেকর্ড ১৯টি আসন ইসরায়েলের রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মহলের একটি অংশ তাঁদের ক্ষমতার অংশীদার করতে আগ্রহী নয়। নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যান দুজনই আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন। ফলে বিরোধী জোটের পক্ষে আরব দলগুলোর আসন যুক্ত করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে।

তবে ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হলেও দেশটির সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন নাও আসতে পারে। সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকোট ইরান ও হামাসের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের পক্ষে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও বিরোধী তিনি। নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর প্রধান মতপার্থক্য দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা নিয়ে। ফলে নতুন নেতৃত্ব এলেও ইরান, ফিলিস্তিন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়ে ইসরায়েলের অবস্থানে বড় পরিবর্তন হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

ভারতের জন্য ইসরায়েলের নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ

ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন আর শুধু অস্ত্র কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম যৌথভাবে উৎপাদন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি, পানিব্যবস্থাপনা, মহাকাশ গবেষণা ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বিস্তৃত হয়েছে। ফলে ইসরায়েলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতার গতি এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ধরনেও প্রভাব পড়তে পারে।

আইজেনকোটের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ইসরায়েল বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। গাজা পরিস্থিতি নিয়ে দেশটির বিরুদ্ধে ওঠা সমালোচনার জবাব দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টাও করতে পারে নতুন সরকার। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি বিদ্যমান সহযোগিতা অব্যাহত রাখার চ্যালেঞ্জ থাকবে।

ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি ভারতের জন্য বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। ইরানের সঙ্গেও দেশটির দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক বসবাস করেন।

এ কারণে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি আরব দেশগুলো ও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সহযোগিতা বজায় রাখা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে ইসরায়েলের নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ভারতের জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। একদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব ধরে রাখা, অন্যদিকে আরব দেশ ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, দুই দিকেই সতর্কভাবে এগোতে হবে নয়াদিল্লিকে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক সমাধানের বিষয়ে ভারতের অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button